মোঃ নোমান সরকার
বাগদাদ! কে বলবে ছবিটা ১২৫৮ সালের আগের বাগদাদ শহরের! শত শত বছরের তিল তিল করে গড়ে উঠা অতুলনীয় কারুকাজ করা শহর এখনো প্রেরণা স্থাপত্য শিল্পীদের জন্য। অবাক বিস্ময়ে সেই কাজ আর কারুকাজ ভাবায় সব ধরনের মানুষকে। এত বছর পরেও শহরের এই মডেলটি সম্ভবত আর তৈরি হয়নি। শহরের এই ছবিটাই প্রমান করে এ যেন এক স্বপ্নের উদ্যান, স্বপ্নের শহর! রূপকথার মতনই! গোটা ইউরোপ সহ সারা দুনিরার ছেলেমেয়েরা এখানেই পড়তে আসত। জ্ঞানে বিজ্ঞানে তারা ছিল সবার সেরা তখন। নিজেকে কিছুটা সময়ের জন্য সেই শহরের বাসিন্দা মনে করে কল্পনা করে দেখতেই পারি আমরা।
তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা ছিলেন আল-মুসতাসিম বিল্লাহ। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান বিশাল মঙ্গোল বাহিনী নিয়ে বাগদাদ আক্রমণ করেন। ১২৫৮ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাগদাদ অবরুদ্ধ ছিল। মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে ২০,০০০ অশ্বারোহীর একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু সৈনাবাহিনী বেতন না দিয়ে এই বাহিনীকে অযোগ্য করে রাখা হয়েছিল বহুকাল আগে থেকেই। শক্তিশালী সেনা বাহিনীর প্রয়োজন মনে করেননি খলিফা। ফলে দুর্বল সেনা বাহিনী খুব কম সময়ে পরাজিত হয়। এই অশ্বারোহীরা মঙ্গোলদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হলেও পরের সময়টাতেও দুর্বল সেনাদের কারনে বড় ধরনের প্রতিরোধ করতে পারেনি।
ভোগ বিলাসে ডুবে থাকা বাগদাদবাসী স্বপ্নেও ভাবিনি কি ঘটতে যাচ্ছে তাদের সাথে। ১০ ফেব্রুয়ারি শহর আত্মসমর্পণ করে। ১৩ তারিখ, ১২৫৮ মঙ্গোলরা শহরে প্রবেশ করে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। পালিয়ে যেতে চেষ্টা করা নাগরিকদেরকে মঙ্গোলরা গণহারে হত্যা করে খুব অল্প দিনেই। দ্য নিউ ইয়র্কারের ইয়ান ফ্রেজিয়ারের মতে মৃতের সংখ্যা ২,০০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০। বাগদাদবাসীদের হত্যা করে তাদের মাথার খুলি দিয়ে পিরামিড তৈরি করে রেখেছিল যাতে মঙ্গলদের ভয়ে সবাই দিশেহারা হয়। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ গ্রন্থাগার এই সময় ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচিত অসংখ্য মূল্যবান বই হারিয়ে যায়।
কত অল্প সময়ে কি অবাক করা পতন! কি বিস্ময়! ভোগ বিলাসে ডুবে যাওয়া মানুষের নির্মম পরিনিতি এমন হয় কে বুঝতে চায়! আসলে রাষ্ট্র হোক আর ব্যক্তি জীবনেই হোক ভোগ বিলাসের পরিনতি হয়ত এমনই হয়। বাগদাদ শেখায় আমাদের, যে যত বড় তার দায়িত্ব ততো বড়। নিজের আনন্দটাই তাই বড় করে দেখতে নেই। সেই সময়ের সেরা দেশের এমন অবাক করা পতন এবং এত দ্রুত পতন আমাদের কি ভাবায়? নিজের জীবন, নিজের সমাজ, নিজের রাষ্ট্রকে আঁকড়ে রাখতে না পারলে পরিনতি এমনই তো হয়! কি অবিশ্বাস্য পতন! আসুন আমরা নিজেকে দেখি। নিজের মধ্য দিয়ে নিজের পরিবার, নিজের সমাজ, নিজের দেশকে দেখি। ভাবতেই হবে। মৃত্যুর আগে জেনে যাই, আমরা ‘মানুষ’ ।
ভুলে যাওয়া যাবে না এই দোয়া, “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।” আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক (বা অভিভাবক)। [কোরআন, সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৩]
মানুষ সৃষ্টিকর্তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি পতনের মধ্য দিয়ে দেখতে পায়।

