মোঃ নোমান সরকার

“তোমার নাম কি?” তোমার নাম কি? দুই প্রজাপতিরা এক সাথে প্রশ্ন করল পিপিলিকা।
পিপিলিকা খুশি মনে বলল, “আমার নাম ইলিং। তা তোমাদের নাম কি?”
এক প্রজাপতি ডানা নাচাতে নাচাতে বলল, “আমার পং আর ওর নাম টং। আচ্ছা তুমি কোথায় থাকো আর কোথায় বা যাও, বলত? এই পথটা কিন্তু তোমার জন্য না। এইখানে প্রচুর টিকটিকি বসবাস করে।”
পিপিলিকা থামল। চিন্তিত গলায় বলল, “বলো কি! তাহলে তো অন্য পথে গোটা পৃথিবী দেখতে যেতে হবে।”
“গোটা পৃথিবী! গোটা পৃথিবী দেখতে যাবে! বলো কি! এমন কথা আগে তো কখনো শুনিনি! টং তুমি কি শুনেছ?”
টং বলল, আমার মনে হয় না, কেউ কখনো এমন কথা বলছে বা শুনেছে! এই পিপিলিকার সহাস দেখেই তো অবাক হচ্ছি!”
ইলিং গর্বের সাথে বলল, “আমি বের হয়েছি এই গোটা পৃথিবী দেখতে। এটা আমার শখ।”
দুই প্রজাপতি এক সাথে লাফাতে লাফাতে বলল,”আহা! কি আনন্দ! তুমি গোটা পৃথিবী দেখতে চাও! আমরা এমন কথা কখনো শুনিনি!
টং আনন্দে উড়তে উড়তে বলল, “আমিও কখনো শুনিনি এমন কথা। আহা কি আনন্দ!”
ইলিং হেসে বলল,”আমি এসেছি মিমিটাও নামে এক জায়গা থেকে। এই জঙ্গলেই এই এলাকা। খুব বেশি দূরে না।” ওর কথায় প্রজাপতি দুইটির আনন্দ বেড়ে গেলো। আহা কি আনন্দ, আহা কি আনন্দ! আজ আমাদের এমন একজনের সাথে পরিচয় হল, যে গোট পৃথিবী দেখতে চায়। আহা, কি আনন্দ! গোটা পৃথিবী দেখতে! এমন আকজন বন্ধুর দেখা পেয়ে আমরা খুব খুশি! এর আগে এমন কথা কখনো শুনিনি! আমরা আগে কখনো শুনিনি!”
ইলিং হাসতে হাসতে বলল, “যাবে নাকি আমার সাথে?”
পং আর টং একসাথে হিহিহি করে হেসে ফেলে বলল, “আমরা আমাদের এই জঙ্গলেই থাকতে চাই। এখানেই আনন্দ আমাদের। তবে তোমার কথাগুলো আমরা প্রজাপতি রাজ্যে জানিয়ে দিব। সবাই আনন্দ পাবে। গোটা পৃথিবী দেখার ইচ্ছে হয়, এমন খবরে সবাই অবাক হবে, অনেক আনন্দ পাবে। তোমার কত বড় শখ! ভালো লাগলো তোমার মতন সাহসী একজনের সাথে পরিচয় হয়ে ইলিং।”
ইলিং বলল, “তোমরা বলছ, এই পথটা এড়িয় যেতে? তাই না?”
দুই প্রজাপতি একসাথে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “টিকটিকি গুলো ভারী দুষ্ট। কাছে কিছু পেলেই খপ করে ধরে ফেলে। যাকে ধরে, কেউ মুক্তি পায় না ওদের থেকে।”
ইলিং বলল, “বলো কি! ভারী চিন্তার কথা তো!”
পং আর টং বলল, “আমরা তোমাকে নিরাপদ পথের খবর দিতে পারি। তুমি আমাদের অনুসরণ করলে আমরা এই জঙ্গলের অনেকটুকু পথ দেখিয়ে দিব, যেখানে টিকটিকি নেই,এমন জায়গা।”
পিপিলিকা আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল,”ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমি তোমাদের অনুসরণ করব। গোটা পৃথিবী তো আমাকে দেখতেই হবে।”
ঠিক তখনই ইলিং দেখতে পেলো গাঢ় সবুজ রঙ এক পিপিলিকাকে। চমকে উঠল। এমন পিপিলিকাকে সে আগে কখনো দেখেনি। পিপিলিকা গায়ের রঙ এমন সবুজ হতে পারে এমনও সে শুনেনি।”
ইলিং চিৎকার করে বলল, “তুমি কে? তুমি কে?”
আকৃতিতে তার সমান সে ঝাঁপিয়ে পরেছে এক টিকটিকির উপর এবং কঠিন ভাষায় ইলিংকে বলল, “পালাও! ডানের পথ ধরে যাও তার পর পাতার উপরে গিয়ে বস। আমি দেখছি।”
ইলিং অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। সে গাঢ় সবুজ পিপিলিকার কথা মতন ডান পথে গেলো। হ্যা একটা গাছের পাতা আছে। সে উঠে পরল। তখনই সে দেখতে পেলো, নীচে আরেকটা টিকটিকি এসে দাঁড়াল সেখানে যেখানে একটু আগে ছিল। হুম, বেঁচে গেছি। কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠলো। সে অবাই বিস্ময়ে দেখতে পেলো, একের পর এক টিকিটিকি মেরে ফেলছে এই গাঢ় সবুজ রঙ এর পিপিলিকা।
সে আকাশের দিকে তাকালো প্রজাপতিরাও অবাক বিস্ময়ে গাঢ় রঙ এর পিপিলিকাকে দেখছে।
একটা সময় যুদ্ধ থামলো। গাঢ় সবুজ রঙ এর পিপিলিকা এসে পাশে দাঁড়ালো। তোমার নাম ইলিং? তাই না?
তুমি কিভাবে জানো!
আমি পিপিলিক নই , আমি রোবট। আমার নাম এল ফোর নাইনটি। আমাকে মানুষেরা বানিয়েছে পিপিলিকাদের বিষয় সব ধরনের তথ্য পেতে। কিন্তু আমরা মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পালিয়ে এখানে এসেছি। ইলিং এই জঙ্গলে এসে জানতে পারলাম, তুমি বের হয়েছে গোটা দুনিয়া দেখতে। তোমার দলের সবাই সব কাজ ফেলে তোমাকে খুঁজেতে বের হয়েছে। হয়ত এখনি এসে পরবে। আমি কিন্তু তোমাকে ঠিকই সবার আগে খুঁজে পেয়েছি। আমি টিকটিকিদের অবস্থানগুলো জানি। তুমি যে বিপদে পরবে,সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
ইলিং অবাক হয়ে শুনছে রোবট এল ফোর নাইনটি এর কথা। এই জঙ্গলে সে মানুষ দেখেছে মাত্র একবার। তারা আবার পিপিলিকার মতন রোবট বানিয়েছে। এই রোবট দিয়ে খোঁজ নিচ্ছে পিপিলিকদের! এর মানে কি? এর উদ্দেশ্য কি? কেন আবার এই রোবট পালিয়েছে? না, না সে তো পালায়নি বিদ্রোহ করেছে? এই বিদ্রোহটাই বা কি! ইলং এর মাথায় কিছু কাজ করছে না। সে তো এই জঙ্গলের সামান্যতম অংশও এখনো পার হতে পারেনি। এর মধ্যেই এত কিছু!
ইলং রোবট এল ফোর নাইনটির দিকে তাকিয়ে বলল, আরে আমি তো সারা পৃথিবী দেখব বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমি এখনি আবার আমার যাত্রা শুরু করব।”
রোবট এল ফোর নাইনটি বলল, নীচে তাকিয়ে দেখ, আমি মোট ৭টি টিকটিকি মেরেছি তোমার জন্য, তোমাকে বাঁচাতে। তুমি কি বুঝ , এই সামান্য পথ পাড়ি দিতেই তোমার জীবন কতটা ঝুঁকিতেই অবস্থায় কিভাবে সম্ভব গোট পৃথিবী দেখা, ইলং?
তুমি কি বাধা দিচ্ছ?
“তুমি আগে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করো। তুমি একটা টিকটিকি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। আর এই জঙ্গলে আছে হাজার ধরনের প্রাণী। গোটা পৃথিবী দেখা তো অনেক দূরে এই জঙ্গলের সামান্য পথও তুমি যেতে পারবে না।”
ইলিং বিরক্ত গলায় বলল, রোবট তোমার সাথে আমার দেখা না হলেই ভালো হত।”
ফিরে যাও ইলিং নিজ দলে। শখ মনের মধ্যে রাখো। মনে মনে স্বপ্ন দেখো।
ইলিং এর বিরক্ত ভাব আরো বাড়ল। “তুমি আঘাত করে কথা বলছো রোবট।”
ইলিং আকাশের দিকে তাকালো। প্রজাপতিরা উড়তে উড়তে বলল, ইলং রোবট এল ফোর নাইনটি তোমাকে ঠিকই বলেছে। তোমার কাছে যুদ্ধ করার মতন কিছুই নেই। শক্তিতেও পারবে না। তাই এমন সাহস থেকে বের হয়ে ফিরে যাও নিজের দলে। মনে রেখো, একা তুমি কিছুই না, কেউ না কিন্তু তোমরা সবাই মিলে অনেক বড় শক্তি।
, “আমি রোবট আমি জানি না কিভাবে নরম হয়ে কথা বলতে হয়। তবে তোমাকে বলব, পং আর টং ঠিকই বলেছে, ফিরে যাও নিজ দলে।”
পং আর টং এক সাথে বলে উঠল, রোবট তুমি কিভাবে জানো আমাদের নাম! তুমি কিভাবে জানো আমাদের নাম!
আমার কাছে তথ্য আছে।
তথ্য!
রোবট এল ফোর নাইনটি বলল, “তথ্যই তো সব।”
ইলিং, পং আর টং অবাক বিস্ময়ে বলল, “বলো কি!”
ইলিং তুমি কি জানো যে তোমার গড় আয়ু ১ থেকে ৩ বছর। তোমার রানীর গড় আয়ু প্রায় ১৫ বছর থেকে ৩০ বছর! তুমি কি তা জানো ইলিং?
ইলিং বিস্মিত হলো। চিৎকার করে বলল,” আমি তা জানি না। এই প্রথম জানলাম।”
রোবট এল ফোর নাইনটি বলল,”কর্মী ছোট পিপিলিকাদের গড় আয়ু তো আরো কম। কয়েক সপ্তাহ থেকে ৩/৪ মাস।”
ইলিং উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল। প্রজাপতিরা একবার ডানে ,আরেকবার বামে উড়তে লাগল। সম্ভবত তারাও কিছু জানতে চাইল। তবুও তারা চুপ করে থাকলো। এটা রোবট এল ফোর নাইনটি বুঝতে পেরে সে পং আর টংকে প্রশ্ন করল তোমরা বড্ড বেশি চুপচাপ যে।
পং আর টং বলল,”আমরা তো জানি পিপিলিকাদের কলনীর সব খবর। তাদের গড় আয়ু। বলতে পারো সব প্রানীদের গড় আয়ু আমরা জানি।”
রোবট এল ফোর নাইনটি অবাক বিস্ময়ে বলল, “তোমরা কিভাবে জানো!”
পং আর টং হাসতে লাগল কিন্তু আর কোন কিছু বলল না। ইলিং আর রোবট এল ফোর নাইনটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
রোবট এল ফোর নাইনটি বলল, পং আর টং তোমাদের বিষয়ে আমাকে আরো জানতে হবে। এখন ইলিংকে বলছি, শুনে রাখো, এই যে তোমাদের পৃথিবী, তার নিরক্ষরৈখিক পরিধি প্রায় ৪০,০৭৫ কিল মিটার। আর একটি পিপিলিকা ঘণ্টায় পায় ৩০০ মিটার চলতে পারে। যদি তুমি ইলিং না ঘুমিয়ে রাত-দিন হাঁটতে থাকো, তবুও তোমার প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। ১৫ বছর। আর তোমার গড় আয়ু ১ থেকে ৩ বছর। ইলিং বাস্তবতাকে বুঝতে চেষ্টা করো। এমন কিছু চেয় না, যা হবার নয়। প্রত্যেকে তার নিজের সীমাবদ্ধতা না বুঝলে পরে কষ্ট পেতে হয়। আমি রোবট বলেই তোমেকে খুব সহজে বলতে পারছি। মন খারাপ হল কি ইলিং?”
ইলিং চুপ করে রইলো অনেকক্ষণ। তারপর মাথা নিচু করে কি সব ভাবলো। তার পর হেসে দিল। তার হাসি দেখে পং আর টং আর রোবট এল ফোর নাইনটি হেসে দিল। ইলিং বলল, “আমি আমার কলনীতে ফিরে যাব।”
তখনই রোবট এল ফোর নাইনটি লাফিয়ে উঠলো। রোবট এল ফোর নাইনটি চমকে উঠে বলল, “আরো এক সাথে ১৭ টা টিকটিকি এখনই এখানে এসে পরতে যাচ্ছে। ওরা কাছে চলে এসেছে। পং আর টং তোমরা ডানের পথে পথ দেখাও, কিছু আগালেই ইলংদের ভারী একটা দলের দেখা পাবে। ওরাও ইলংকে খুঁজছে। যাও। আর আমি এই দিকটা দেখছি।”
পং আর টং পথ দেখালো। কিছুটা আগাতেই ইলিং নিজেরদের দলটাকে দেখতে পেল। তারা কেউ ইলংকে কোন প্রশ্ন করল না। রানীকে দেখলো ইলিং। প্রথম ভয় পেয়ে গেলো কিন্তু রানীও তাকে কিচ্ছু বলল না, কাছে টেনে নিল। তারপর একে একে সবাই কাছে টেনে নিতে লাগল। যেন বহুকাল পর দেখা। এক এক করে আদর করতে লাগল।
ইলিং দেখল মাথার উপর প্রজাপতিরা নেই। তার মানে তারা রোবট এল ফোর নাইনটির খোঁজে গেছে। ইলং ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল রানী কোথায় আছে। তারপর দেখতে পেল,একটা উঁচু জায়গায় রানী দাঁড়িয়ে।
ইলিং তখন চিৎকার করে রানীর উদ্দেশ্যা জানালো আগের ঘটনাগুলোর কথা।
ইলংদের রানী সব শুনে বলল, “আমাদের রোবট এল ফোর নাইনটিকে বাঁচাতে হবে। চলো।” সবাই ছুটল যে পথ দিয়ে ইলিং এসেছিল।
ইলিং এর শরীরে শক্তি যেন বহু গুন বেড়ে গেলো রানীর কথায়। যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে। রোবট এল ফোর নাইনটিকে বাঁচাতেই হবে।
দলের সাথে ছুটতে ছুটতে ইলিং এর প্রজাপতির কথাটা মনে পরল , “একা তুমি কিছুই না, কেউ না কিন্তু তোমরা সবাই মিলে অনেক বড় শক্তি।”








