মোঃ নোমান সরকার
রাজা বলল,’রানী, শিকারে যতবারই যাই ততবারই মনে হয়েছে আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে আরো বিশাল দুনিয়া আছে যা আমরা দেখিনা। জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি বানিয়েছেন লাখ লাখ গাছ , যা দিয়ে গড়া এই জঙ্গল। এর একটা কঠিন আর রুক্ষ সৌন্দর্য আছে যা জঙ্গলে না ঘুরলে কেউ তা বুঝতেই পারবে না। আর এই যে প্রসাদের বাইরের যে বাগান তা আমরা বানিয়েছি। তিনি মানুষ বানিয়ে মানুষকে জ্ঞান দিলেন, আবেগ দিলেন, মন দিলেন যে,সেই মানুষ বানালো বাগান, ঘর, পুকুর, এমন আর কত কি।‘
রানী হাসল, ‘আপনি কি আবার শিকারে যেতে চাচ্ছেন? কিন্তু তা তো হবে না। আপনাকে আমরা যেতেই দিব না। আমরা মা মেয়ে আপনাকে আটকে রাখব এইবার।‘
রাজা হাসলো।‘না না আমি শিকারে যাবার কথা তো বলছি না। আমি বলছি, জঙ্গলের কথা। এবার তো জঙ্গলে অনেক দিন থেকেছি শিকারে গিয়ে। মনে হচ্ছে অনেক নতুন কিছু জেনেছি।‘
রানী অভিমানী গলায় বলল,’আমি আপনার জঙ্গল নিয়ে কোন কথাই শুনব না। আপনি এসেছেন চার দিন হয়ে গেল। আর এই চারদিনে চার হাজারবার জঙ্গলের কথাই কেবল বলে যাচ্ছেন।‘
‘হুম’ ,বলে রাজা নিজেকে থামালেন। বাগানের দিকে তাকালেন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল, যদি এ বাগানের যত্ন ছেড়ে দেওয়া হয় তবে এ বাগান জঙ্গলে রূপ নিবে, জঙ্গল হয়ে যাবে। এর মানে কি? মানুষকে তিনি বানিয়েছেন যেন সে যত্ন করে রাখে নিজের, সংসারের, রাজ্যের? মানুষ হচ্ছে বাগান বা বাগানের মতন। যদি যত্ন না করা হয়, মায়া না করা হয় তবে বাগান জঙ্গলের মতন যেমন হয়, তেমনি মানুষ হয়ে যাবে, কঠিন আর রুক্ষ! তাই না? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই যেতেই লাগল।
রাজা রানীর দিকে তাকিয়ে বললেন,‘তবে কি আমি ভুল করছি? আমি রাজা, সব প্রজার দায়িত্ব তো আমারই। আমি কি পেরেছি মানুষের এই বাগানের যত্ন নিতে?আমার রাজ্য কি বাগান হয়ে আছে নাকি জঙ্গল হতে যাচ্ছে?‘
রানী মৃদু হেসে বলল,‘আপনি পেরেছেন। প্রজারা আপনাকে এত ভালোবাসে আপনি পেরেছেন বলেই। তাদের যত্ন নিতেই আপনি ঘুরে বেড়ান ছদ্রবেশে। এখন আমাদের কথা একটু বলি। আমরা মনে করি, আমাদের মা মেয়ের যত্নে অবহেলা আছে। এখন এর বিচার কি হবে, রাজা? আমরা ত বাগান থেকে জঙ্গল হবার মতনই।’
রাজা হেসে ফেলল। আর তখনই রাজকুমারী দৌড়াতে দৌড়াতে রাজার দিকে ছুটে এলো। আর লাফিয়ে উঠে গেল রাজার কোলে।
‘বাবা! ও, বাবা! তুমি কি আবার শিকারে যাচ্ছ?’
রাজা অনেক আনন্দ নিয়ে বলল,’নারে মা। আগে তো বাগানের যত্ন করি। না হলে আমার এই হাসিখুশি পরিবার বাগান থেকে জঙ্গল হয়ে যাবে।
রাজকুমারি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,’কি বলছ বাবা!’
বাবা হাসতে হাসতে বলল,‘যত্ন না করলে সব বাগানই জঙ্গল হয়ে যায়রে মা।‘
রাজকুমারী অবাক গলায় বলল,’ মা বাবা কি সত্যি বলেছে? নাকি আমার সাথে দুষ্টমি করছে?’
মা এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘বাবা সত্যি কথাই বলছে।‘
রাজকুমারী আদর মাখা হলায় বলল,’ মা তুমি কাছে এসো। মা কাছে যেতেই বাবার কোল থেকে মাকে কাছে ডেকে মায়ের গলা পেচিয়ে ধরে বলল,’আমরা তিন বন্ধু। তাই মা? তাই না বাবা?’
তিনজন এক সাথে হেসে উঠল।